ভাঙা চেয়ার
ভাঙা চেয়ার
___ নজরুল বিন রশিদ
দীর্ঘ ত্রিশ বছর শিক্ষকতা করার পর কেশ বাবু এখন অবসর সময় কাটাচ্ছেন। বিকেলের সূর্য তখন ডুবে ডুবো। আকাশে চারপাশে মেঘেদের আনাগোনা। মনে হলো জীবনের সাদা কালো স্মৃতিগুলো মাথার উপর খেলা করছে। বিশাল জলাশয়ের মাঝখান দিয়ে কাশফুল ঘেরা নদীটি বয়ে চলেছে নিরবধি। যার স্পর্শে ফসলি জমিতে খুব ভালই ফলন হয়। দু'পাড়ে লকলকে সবুজ ঘাসের উপর উঁকি মেরে ভালবাসা জানান দিচ্ছে কিছু বাহারি ফুল। নদী আর দু'পাড়ে ঘাসফুলের ভালবাসার বন্ধনে, আকাশ যেন অদূরের দীঘল মাঠের শেষে এসে চমু খায়। পাখিরা গান গায়। শ্যামা, টুনটুনি, শালিক, দোয়েল, ময়না, বক মাছরাঙ্গা আর অতিথী পাখিদের আনাগোনায় মুখরিত থাকতো নদীটি। এখন ভাটা।
কেশ বাবু। যার মাথার কেশ, বেশ আর চলনে বলনে ষাটোর্ধ বয়স৷ কিন্তু বয়স যেন মুখ বচনে ষোল বছরের তারুন্যকেও হার মানায়৷ এক কথায় ছেলে বুড়ো সবাই তার কথা না হেসে পারে না। একদিন আমি তো কথা শুনে পেটে খিল ধরে বসেই পড়েছিলাম।
কেশ বাবুর দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেরা লেখাপড়া করে বিসিএস পাস করে, ম্যাজিস্ট্রেটি দায়ীত্ব পেয়েছে। অবশ্য কেশ বাবুর কালো কেশগুলো শুভ্র হওয়ার পেছনে কিছুটা খাটুনি ছেলেদের পেছনেই। পেনশনে এসে বাড়িতে একা একা থাকতে হয়। বাবার দেওয়া একটা মাটির ঘর৷ দুই পাশে আগা গোরা ফাটল আছে। মনে হয় উচ্চ মাত্রার কোন ভূমিকম্প আসলেই আর নিস্তার নেই।
পড়ন্ত বিকালে সূর্যস্নান আর সবুজের বুকে নিজেকে বিলিয়ে দিতে ভাল লাগে।কিছুটা হলেও বিষন্নতা কেটে যায়৷ সেদিন বিকেল বেলা ঘুড়তে গিয়ে কিছুটা দূরে দেখলেন কে যেন এদিকে আসছে। সচরাচর এদিকে কেউ আসে না৷ গায়ে পাঞ্জাবী, পরনে লুঙ্গি আর মাথার উপরে একটা ছাতাও আছে। দূর থেকে দূরের বয়সে চেহার ম্যাপ করারটা খুব কষ্ট হচ্ছে কেশ বাবুর৷ আরেকটু কাছে আসতে দেখলেন, লোকটিকে কেমন জানি পরিচিত মনে হচ্ছে৷ একেবারে কাছে আসাতে কেশ বাবু ক্ষীন স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন;
_মহাশয়, আপনি কি ইসমাইল শাহ?
_ হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?
_আমি কেশ বাবু। সেই মাধ্যমিকের তোমার বন্ধু কেশ। ইসমাইল শাহ এতক্ষণে চিনতে পারলেন। _আরে কেশ! কেমন আছো বন্ধু? কত যুগ তোমায় দেখি না।
কেশ বাবু অনেক দিন পরে মনে হলো হারিয়ে যাওয়া কোন আপনজন পেলেন৷ মুহুর্তের মধ্যে ইসমাইল শাহকে দুই বাহু দিয়ে জড়িতে ধরলেন। চেহারায় কেমন কষ্ট ভাব। গায়ের চামড়া ঢিলে। এক সময় ফুলের সুভাসে মৌমাছি চারপাশে গুনগুন করতো। যার গুনে সু-দর্শন রমনীরাও বশ হতে বাধ্য৷ কেশ বাবুর কালো কেশ এখন বক সাদা। বেছে নিলে কয়েকটা কালো পাওয়া খুবই দুস্কর।
কিছুক্ষন দু'জনে আবেগঘন মুহুর্তে স্মৃতিচারন করলেন৷
আচ্ছা ইসমাইল, বলো, এখানে তুমি কেন?
_ মেয়ের বাড়িতে এসেছি। জামাই ফোনে অনেক বার বললো, তাই না এসে পারলাম না। ছেলেটা আমাকে পাচঁশত টাকা দিয়ে বলল, বাবা তুমি চলে যাও। ভাবলাম ঘুড়েই যাই। মেয়েটাকেও কতদিন দেখি না।
_তারপর, তোমার কি খবর বলো কেশ?
তোমার সংসার জীবন কেমন চলছে?
ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছো মনে হচ্ছে।
কথাটা শুনার পর কেশ বাবু কিছুটা নিরব হয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুড়ালেন। হাতের লাঠিটা ভর দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷
চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার চোখে জলে টলমল করছে৷
ভদ্রতার খাতিরে বললেন, ভাল ভাই।
_ছেলে, মেয়ে?
_এই তো, ছেলেরা তাদের সংসার নিয়ে শহরেই থাকে। শহরের অলিগলি, বড় বড় বড় দালান, এতো কিছু কি আর আমি বুঝি। ধম বন্ধ হয়ে আসে। দু'টি মেয়েকে নিয়ে তাই গ্রামেই থাকি।
মেয়ে দুটি, বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। এই তো এই বার ত্রিশের কোটা পেরিয়ে গেল। বেশ চিন্তায় কাটছে দিনগুলো। লজ্জ্বা না রেখে বলেই ফেললো কেশ৷ যেদিক থেকে প্রস্তাব আসে, নগদ টাকা আর ফার্নিচার চায়, না হয় ছেলেকে ভাল বেতনের চাকরী দিয়ে দিতে হবে৷ কিন্তু আমি তো অসহায়।
অসহায়!
ইসমাইল শাহ বিস্মিত হলেন।
ইসমাইল শাহ আগেই কিছুটা অনুমান করেছিলেন, কিছু একটা হয়েছে৷
_কেশ বাবু বললেন, অবাক হওয়ার কিছু নেই ভাই৷ ষাটোর্ধ বয়স। চামড়ায় ভাজ পরেছে৷ হাড়ে ক্ষয় ধরেছে। দৃষ্টিটাও ক্ষীণ। এখন কি আর আমার মতো বুড়ো লোককে কেউ দেখবে বলো।
_কেন, কেশ?
তোমার ছেলেরা তোমায় দেখে না?
_না রে ভাই৷ তারা শহরে বউ নিয়ে থাকে। গত ছুটিতে এসেছিল। বউমার, আমার বাড়ির পরিবেশ ভাল লাগে না। একবার তো আমার সামনেই বলে ফেললো,
ছিঃ, এই সব নোংরা পরিবেশে কোন মানুষ থাকে নাকি?
আর সাথে সাথেই আমি পশু হয়ে গেলাম। মুখের জবান বন্ধ। সেদিন রাতে তো ঝগড়া করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ছেলেটাকে নিয়ে। ছেলেটা যাওয়ার সময় আমার হাতে এসে কিছু টাকা গুছে দিয়ে দিলো আর সাথে সাথে বউ মা এসে মুছে নিয়ে নিলো৷ এর পর থেকে আর খবর নেই৷ একটা ফোন নম্বর ছিল৷ আমি প্রতিদিন সকালে ফোন দেই৷ ফোনটা কানের কাছে নিলেই একটা দীর্ঘশ্বাস আসে।
এই যে দেখছো নদীটি, ভরাট হয়ে গেছে। কোন নদীর সাথে মিল নেই। নেই যৌবন। এখন আর চারিপাশে মাঠে পানি দিতে পারে না। কেউ তার বুকে সাতার কাটতে পারে না। একাই পড়ে আছে নিথর দেহ নিয়ে। কিন্তু তার পাশে ঘাসফুলগুলো দেখো, ছেড়ে যায় নি। ভালবাসার বন্ধনে দেখ, এখনো জড়িয়ে আছে৷ কেশ বাবু অনর্গল বলতে লাগলেন। আর ইসমাইল শাহ দুই উড়ুড়ে হাত দিয়ে মাটিতে বসে শুনতে লাগলেন।
ধীরে ধীরে কেশ বাবুর কন্ঠটা ছোট হয়ে আসে। কথা যেন বের হতে চায় না। আকাশে তখন বিদুৎ চমকাচ্ছে। মেঘগুলো সাদা থেকে কালো রুপ ধারন করেছে৷ চারিদিকে কিছুটা দমকা হাওয়া শুরু হল৷
_ইসমাইল, চল আমার বাড়িতে। মনে হয় বৃষ্টি শুরু হবে৷ এ কথা বলেই লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাড়ালেন কেশ বাবু। বুকের ভেতরটা কেমন জানি চিন চিন করে উঠলো৷ মনে হয় কঠিন একটা ব্যাধি হয়েছে৷ মরণে যার ভয় নেই। ব্যাধি তো কিছুই না। বুকে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
এসো ভাই।
_তুমি কি অসুস্থ?
_ও কিছু নয়, চলো যাই। নদীর পাড় ধরে বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছে কেশ বাবু আর ইসমাইল শাহ৷
খানিকটা দূরেই কেশ বাবুর টিনের চালার ঘর৷ কিছুটা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি কাদা মাটি পিচ্ছিল হয়ে আছে। জীবনটাও যেন পিচলে গিয়ে কোন গর্তে পড়ে আছে৷ বাড়িতে গিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ ইসমাইল শাহ ঘরে ঢুকেই লম্বা সু-দর্শন একটি মেয়ে দেখলেন। গায়ের কালো জামাটা একটু ছেড়া। হঠাৎ বুঝে উঠার আগেই ছেড়া জায়গাটা হাত দিয়ে টেনে ধরলেন মেয়েটি।
এদিকে এসো মা, ইসমাইল শাহ বললেন৷
কাছে আসাতেই দেখতে পেলো সুন্দর মুখ খানাতে একটা প্রচন্ড কষ্টের ছাপ। চুপ করে হাতে হাত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের কোণে একটা ভাঙা চেয়ার, অনেক ধুলো বালি পড়ে আছে৷ তার পাশে একটা চেরাগ। নিভু নিভু আলো জ্বলছে।
কেশ বাবু ভাঙা চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অযত্নে অবহেলায় আজ চেয়ারটার করুন অবস্থা। অথচ এক সময় কত মানুষের বোঝাই না কাধে সয়েছে। পলক মুহুর্তেই মনের অগোচরে এক ফোটা চোখের জল পড়ে আলোটা নিভে গেলো।
Comments
Post a Comment