কালী

কালী
___নজরুল বিন রশিদ

তখন ভাতের খুব অভাব ছিল কিন্তু ভালবাসার অভাব ছিল না। একটা মানুষের সব কিছুর অভাব মিটাতে পারে ভালবাসা আর সেই ভালবাসার জন্য কতই না দৌড়ঝাপ দিয়েছিল জয়দেব। কালীর অষ্টম শ্রেনীতে থাকা অবস্থায় মনের শিহরনের অনুভব বুঝতে পারল। গোলাপী আর সাদা কালোয় মিক্সড করা অসাধারন রংয়ের একটা টপ সেট পরিহিত লম্বা সুন্দরী মেয়েটি যখন জয়দেবের সামনে এসে দাড়ালো, বাগানের ফুলগুলো তখন মনের অজান্তেই সুগন্ধ ছড়াতে লাগল। জয়দেব তখন মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ শিক্ষায় পা পড়েছে। পাহাড় ঘেষা লাল মাটির টিলা বেয়ে জীবনের প্রতিটা দিনই অতিবাহিত করেছে জয়দেব। কালী আর জয়দেবের দেখা হওয়ার পর থেকেই তাদের মধ্যে চোখে চোখে প্রনয়ের ভাব চলতে থাকে। তখন শুধু চোখে চোখেই ছিল বিশাল সাগর থেকে ঝিনুক কুড়ানোর মত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আন্তরিকতার গভীরতা শুরু হয়।
কালী স্কুলে আসার পথে জয়দেব তিন রাস্তার মোড়ে দাড়িতে থাকতো। তেমন কোন সাড়া শব্দ করতো না। শুধুই তাকিয়ে থাকতো। জয়দেবের মনে মনে কিছুটা ভয় ভয় কাজ করতো। কারন নিজের ব্যক্তিত্ব আর সামাজিকতার মুল্যায়ন সে কিছুটা হলেও বুঝে। তাই কিছুদিন স্কুলের রাস্তার আর জয়দেবকে দেখা গেল না। কালী প্রায় সময় স্কুলে যাওয়ার পথে এদিক সেদিক তাকাতো কিন্তু সে যাহা খুজতো তাহার অস্তিত্ব শুধুই মনের মনিকোঠায় ছিল। হঠাৎ ভাবলো জয়দেব এর কিছু হলো কিনা। জয়দেবের ছোট ভাই অংকুশ ছিল কালীর ক্লাসমেইড। অংকুশ গতবার অষ্টমে অকৃতকার্য হয়েছিল বিধায় কালীর সাথে এতটা কথা হয় না। তবে জয়দেবের সাথে কালীর ভাবের বিনিময়ে অংকুশের সাথে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করতো না। মনে জোর হল সবচেয়ে বড় জোর। আর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কালী একটু চিরকুট লিখল।

চিরকুটে লিখা ছিল,
"অভাবে আসিয়া কেন এভাবে গেলে চলে?
নিদ নাহি আখিতে মোর কি রাখিলে ফেলে।
বায়ে যদি আসো তবে খোজ নিও মোর,
তোমারি আখিতে গাথা মোর আখির ভোর।"

এতটা কচি হাতের ভারী লেখাটি যখন জয়দেবের হাতে পড়লো। জয়দেব আবেগে আপ্লুত হয়ে, শোয়ার ঘরে গিয়ে, বাংলা ব্যবকরণ বইটা হাতে নিয়ে। চিঠি লিখার অধ্যায়টা খুজে বের করল। এই প্রেম পত্রের কোন উত্তর বইতে পেল না। খাতাটা হাতে নিয়ে কলমের মাথা কামড়াচ্ছে আর ভাবছে। দু'কলম লিখেই ঘরের মেঝেতে সাদা মুড়ানো পাতায় ভরিয়ে দিল। মাদুর পাতা আর ছেড়া কাথার ভীড়ে কনকনে শীতে সারা রাত ঘুম আসে নাই। জয়দেবের বাল্য বন্ধু কানাই এর কাছ থেকে শুনেছিল মেয়েদের নাকি অল্পতেই বুদ্ধি পাকে। তার প্রমাণ সে ঐ চিরকুটেই পাইয়াছে। কতটা ভাব তৈরী হলে এত সুন্দর লেখা লিখতে পারে। ভোর রাতে অনেক ভেবে একটা লিখা লিখলো। কিন্তু ছোট দাদাকে দিয়ে সেই চিরকুট দেওয়ার সাহস তার হয়ে উঠেছি। সকাল হতেই আগের মত করে রাস্তার ঐ পাশে গিয়ে দাড়ালো।
সেদিন কালী আবেগে আপ্লুত হয়ে নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। যাওয়ার সময় পাশ ঘেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিস করে মনের অজান্তেই জয়দেবকে বলল, আমি স্কুলে যাচ্ছি, আজকে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আপনি আসেন বলেই চলে গেল। জয়দেব এর আর কিছু না বুঝার বাকি রইল না।

স্কুল ফাঁকি দিয়ে স্কুলের পূর্বপ্রান্তে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। সেই গাছটার পাশেই কালী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একডাল ভরা কৃষ্ণচূড়া ফুল। পায়ে আলতা মাখা, মাথায় লাল বেনী করা কৃষ্ণচূড়ার নিচে মনে হয় আরেক কৃষ্ণচূড়া। জয়দেব কাছে যেতেই কালীর ভয়ে ভয়ে ঠোট কাপতে লাগল।

জয়দেব বললঃ কেন ডেকেছ বল?

কালী বলল, আমি ডাকি নাই। আমার মন ডেকেছে।

মন কি বলে?

তাতো মনের ভেতর মন রাখলেই বুঝা যায়।
কৃষ্ণচূড়ার বনে বনে,
তুমি আছ মনে মনে।
সাজিয়েছি তোমার জন্য আকাশ ভরা রঙ্ধনু।
চল না আজ হারিয়ে যাই কোথাও। জয়দেবের এমন কথার জবাবে কালী লজ্বায় মুখ ঘুড়িয়ে বলল। ভালবাসা মনে মনেই ভাল। প্রকাশ হলে ভয় আছে।
কিছুক্ষন পড়েই কে যেন আসছে পায়ের আওয়াজ পেয়েই কালী চলে গেল।
জয়দেব অপলক দৃষ্টি কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

Comments

Popular posts from this blog

প্রার্থনা

ইচ্ছে মনির ইচ্ছে ঘুড়ি(শিশুতোষ কাব্য গ্রন্থ)