আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা বলছি
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা বলছি
___ নজরুল বিন রশিদ
পৃথিবীর আমুল পরিবর্তন চক্রাকারে ঘুর্নিপাকের মত পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে দেশ কাল ও সময় পরিবর্তন হচ্ছে সমাজ ও সমাজের মানুষ পাশাপাশি মানুষের অদ্ভুদ মন। জগৎ এখন ধুলায় পরিপুর্ন। পা কে কাদা মুক্ত রাখতে, সারা শরীরে এখন কাদা।
সময়টা ছিল ১৯৭১ সাল। তখন আমি পচিশ কি ত্রিশ বছরের তাগরা জোয়ান। গায়ে অনেক শক্তি ছিল। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে শুধুই ঘুড়াঘুড়ি আর দুটি হাতের পাখা মেলে উড়াউড়ি ছাড়া তেমন কোন কাজই ছিল না। তবে মাঝে মধ্যে ভাতের অভাবে মনটা খারাপ হয়ে যেত। তারপর ও মিটিয়ে নিতাম। জমির কাকার বাড়ির পাশেই ছিল একটা বিশাল আম বাগান। ইচ্ছে হলেই চলে যেতাম, তার পাশেই একটা খেজুর এবং জাম গাছ। পেটের ক্ষুদাটা একটু হলেও নিবারন হতো।
এগুলো দিয়েই শরীরটা শক্ত ও মজবুত করেছিলাম। হঠাৎ করেই শুনলাম আমাদের দেশটাকে আর দেশের মানুষগুলো ইচ্ছেমত শোষন করে খাচ্ছে ঐ পশ্চিম পাকিস্থানের শাসক গোষ্টী। মা বলেছিল, এর জন্যই আমাদের ভাতের অভাব। আমরা যদি ন্যায্য অধিকার পেতাম, তাহলে আমাদের কোন কিছুর অভাব থাকতো না। তাই পুর্বপাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ বাধল। আমিও দেশের তরে ঝাপিয়ে পড়লাম। যেখানে যাকে পাচ্ছে, মিলিটারীরা গুলি করে মারছে পাখির মত। এক মুটো ভাতের আশায়। ভালভাবে বেচে থাকার আশায় আমাদের এই যুদ্ধ। আমাদের অধিকার আমরা ফিরিয়ে আনলাম দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে। অনেক রক্তের মধ্য দিয়ে। ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তে কেনা আমার এই দেশ। লাখ মা বোনের ইজ্জ্বতের দামে কেনা আমার এই দেশ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই দেশ।
সময়টা এখন ২০১৮ সাল। অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমাদের এই দেশ। শহরে ১০ তালা ২০ তলা ভবনের অভাব নেই। অভাব নেই টাকা পয়সারও। আমরা এখন মহাশুন্যে স্যাটেলাইট স্থাপন করতে পেরেছি। আর দশটা দেশের মত আমরাও পিছিয়ে নেই। সভ্যতার হাতছানি আমাদের অনেক দূরে এনেছে। অভাব শুধুই মনুষ্যত্বের। অভাব শুধু নীতি আদর্শের। আর দিন দিন আমরা ভালবাসা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এখন অনিয়ম, নিয়ম হয়ে গেছে।
মার্ক জুকার বার্ক এর প্রতিষ্ঠিত কমিউনিকেশন এখন আমার হাতে।
আমি কে?
আমি স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পর। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্না।
তবে মৃত নই। এখনো জীবিত। আমার কথা কি তোমাদের কানে পৌছবে? আমি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারিক এর কথা বলছি। আমার পরিচিত বন্ধু মিজানুর রহমান এর কাছ থেকে শুনা।
তার নাম কাজী অাব্দুল বারিক, বয়স ৮৫ ছুঁই ছুঁই।
দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছেন ১৯৭১ সালে
বর্তমানে অভাব অনটনের দরুন তিনি একজন মুচি
যাকে সহজ ভাষায় যদি বলি অামাদের পায়ের জুতা সেলাইয়ের কারিগর....!!!
থাকেন, মিলপাড়া রাম চৌধুরী লেইন কুষ্টিয়াতে।
পরিবারে ৫ মেয়ে অার এক ছেলের বাবা তিনি
কিন্তু সবাই বিয়ে করে নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত, স্ত্রী অাসমা খাতুনকে নিয়ে তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম
একসময় জুতার ব্যাবসা করতেন, শহরের এন এস রোডের মার্কেটে তাদের দোকান ছিলো, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মহাজনের কাছে লোন থাকায় সব হারিয়ে অনেকটা নিঃস্ব তিনি
মনোবল হারান নি, থালা নিয়ে রাস্তায় ভিক্ষা বৃত্তি পেশাও বেছে নেন নি। বরং নিজের পায়ে দাঁড়াতে এই বয়সে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি বঙ্গবন্ধু মার্কেটের বিপরীতে জুতা সেলাই করেন
তাতেই তার সংসার চলে।
স্ত্রী অাসমা খাতুন অনেকটা অসুস্হ, বড় মেয়ে দেখাশুনা করে মাঝে মাঝে কিন্তু তা অনেকটা অপ্রতুল
মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেই, তবে কমান্ডারের স্বাক্ষর করা একটা কাগজ অাছে।
সেটা দিয়ে অনেকবার অাবেদন করেছেন।
স্বপ্ন দেখেন শেষ বয়সে অন্তত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে যেন বিদায় নিতে পারেন। আব্দুল বারিক এর মত আমার পরিচিতি আরেকজন গুনী মানুষ আছেন। যার পরিচয় দিতে গিয়ে আমার চোখের কোণে দু'ফোটা পানি চলে আসলো। সে আর কেউ নয়। আমার হাতে খড়ির শিক্ষক শ্রদ্ধ্যেয় জনাব জজু মিয়া মাষ্টার সাহেব। নামটা উচ্চারন করতে বুকটা কেপে উঠল। কারন একে তো তিনি আমার শিক্ষক। দ্বিতীয়ত এই বাংলার একজন দামাল ছেলে। মহান স্বাধীনতার বীর পুরুষ। দুঃখের বিষয় হল, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর, আজও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পান না।
" কোন সাহায্য চান না, কারো দয়াও নয় "
" শুধু চান সাদা কফিনের উপর এক টুকরো লাল সবুজের পতাকা "
স্যালুট
Comments
Post a Comment