মনু(ছোট গল্প)
মনু (ছোট গল্প)
নজরুল ইসলাম।
দিন ক্ষনের কথা মনে নেই। যতদুর মনে আছে, সেই বার ভাতের খুব অভাব ছিল। চারিদিকে মানুষ কাজের খুজে ঘুড়ছে। যেখানে যা পেয়েছে , তাই গলাধঃকরণ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। মায়ের হাতের গহনা, সে তো সেই কবেই শেষ। বাকি ছিল গায়ের কাপড় খানা। যা পেটের খিদার চেয়ে বেশি। আদিম কাল হলে তার প্রয়োজনটা বাদ দিয়ে দিতাম।
তালেব আর মনোয়ারা, এক সাথে অনেক বছরের বসবাস। মায়ার বন্দনে নিজেদের আলাদা করার কোন ইচ্ছাই নেই। কিন্তু বিধির কি নির্মম পরিহাস, থাকতে চাইলেও থাকা যায় না। এই পৃথিবীর মানুষের থাকার একটা সময় আছে, সেই নিয়ম মেনেই চলার চেষ্টা সবার। ছোট সংসার তাদের। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে তারা। কাজ কাম যা পায় , তাই করে। না বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে । সব কিছুই যেন স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তিন ছেলে নিয়ে কোন মতে সংসারের হাল ধরে রেখেছে তালেব।
মা বলল শেষের ট্রেনে খালা মনির বাড়ি যাবে। জীবনের তাগিদে কিছুটা চিন্তার খোরাকে আধা জলে নামা। পয়সা তো সব জায়গায় লাগে। দারিদ্রতা একটা অসহনীয় বস্তু। আসতে আসতে কোমরের হাড় ভেঙেছে। জোড়া তো লাগেই না বরং অহেতুক ঘষামাজা। সকাল হতেই মা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন খালা মনির বাসায়। উদ্দেশ্য, সেখানে গিয়ে কিছুদিন থেকে কাজ করবেন মানুষের বাড়িতে। টাকা পয়সা যা পায় তা দিয়েই কিছুদিন আধপেটে কাটিয়ে দেবে। সেই বারে আমাদের গাড়ি চলার সাধ্য ছিল না। প্রায় দুই ক্রোশ পথ হেটে হেটে রেল ষ্টেশন এর পাশে গিয়ে পৌছলাম। সময় তখন রাত ঘনিয়ে সকাল। ষ্টেশনের ঝমঝমাট পরিবেশ আর গরম তেলে রুটি ভাজার সু সু শব্দ মনের ভিতর দারুন একটা অনুভুতি তৈরী করেছিল। সেদিন মায়ের হাত ধরে সামনে চোখ রেখে দ্রুত গতিতে হাটছি। মনে হল আমাদের খাওয়া নিষেধ।
সময় গুনে ষ্টেশনে বসে থাকা। মায়ের আচলে মুখ ঢেকে রাখা। পরিচিত মুখ যেন চোখে না পড়ে। ট্রেনে চড়ার ইচ্ছেটা খুব কাজ করছিল। যেতে হবে বহুদুর। সেই হবিগঞ্জ। খালা মনির দেয়া একটা লাল টুকটুকে জামা ছিল পরনে। উপড়ে রঙিন হলেও ভিতরে কয়লার মত কাল রং টা সব কিছুই আছন্ন করে রেখেছে। ট্রেনের বিশাল শব্দ ঝাক ঝকা ঝক করে দক্ষিন দিক থেকে তেড়ে আসছে। এমন সময় হঠাৎ দেখেতে পেলাম পাখির মত উড়ে গিয়ে ট্রেনের সামনে কি যেন পড়ল। সবাই দৌড়ে গেল। পরে শোনলাম, যৌতুক এর অত্যাচারে বাসা ছেড়ে আসা পাখিটির আত্মহত্যা। কত সহজ মানুষের মৃত্যু! শরীরের কাপুনীতে নি:স্তব্ধ চারিদিক। সামনের দিকে পা চালানোর সাহস যেন ক্রমশ রাশ পাচ্ছে।
আমাদের ট্রেনটা আসার সময় হল। দক্ষিণা পবনে বাতাসে ঝক ঝক আর বাশির প্রকট শব্দ কানে বেজে আসছে। নিকটে আসতেই আমার বাহুডোরে শক্ত করে ধরার ছোয়া পেলাম। মায়ের হাতের ছোয়া , না দেখেই বুঝা যায়। উঠেই আসনে বসলাম। আমি মায়ের কোলে। এক বয়স্ক লোক এসে মাকে তুলে দিল। মন চাইছিল ইচ্ছেমত বকা দেই। মা বলল এটা ঐ ভদ্র লোকের আসন। আমরা দাড়ানো যাত্রী। সময়ের সাথে গন্তব্য স্থলে পৌছোলাম।
খোয়াই নামটি আমরা কম বেশি সবাই শুনেছি। এই নদীর কিছুটা উত্তরেই খালা মনির বাসা।
তালেব পাড়া, নামটা শুনেই অবাক হলাম। খালু জানের নাম তালেব উদ্দিন। বাশি আর ঢোলের বাজনা যেন কথা বলে তার হাতে। সন্ধ্যা হলেই যখন সবাই অবসর হয়, তখন মনের খোরাক হিসেবেই গানের আসর জমে। যার যার ইচ্ছেমত সুরে তাল তুলে। বাড়িতে ঢুকতেই খালা মনি আমাকে জড়িয়ে ধরল আর কেদে কেদে বলতে লাগল, এতদিনে খালা মনিকে দেখার ইচ্ছে হইছে বাবা। বলতে বলতে ঘরের ভিতর নিয়ে গেল। ছনের ঘর, বেতের বেড়া। হঠাৎ চোখে পড়ল, মেঝেতে আলোর রেখা। উপরে তাকিয়ে দেখি আকাশ থেকে সূর্যটা চালের ফাক দিয়ে মুসকি হাসছে। তবে এই হাসিটা কেবল গরীবদের বেলায় বেশি দেখা যায়। পান্তা ফুরাতে যাদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে, তাদের বেলায় এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে তাদের সবার এমনিই দশা। পাশের ঘর গুলুও খালের উপর বাশের খুটির উপর বসানো। বর্ষা এলে চারিদিকে পানিতে থৈ থৈ করে। সেনিটেশন এর ভাল ব্যবস্থা না থাকায়, প্রাকৃতিক কাজটা এখানেই সারে। পানিতে মিশে আবার অসুখের দেখা পেতে বেশি সময় লাগে না তালেব পাড়ার মানুষের।
Comments
Post a Comment