পতেঙ্গার পথে(ভ্রমন কাহিনী)

পতেঙ্গার পথে (ভ্রমন কাহিনী)
       নজরুল ইসলাম।

রাতের হিম শীতলে নিজেকে কম্বলের নিচে ধেকে রাখার মজাই আলাদা। অনেক দিন অসুস্থতার পর সুস্থ হয়ে হ্রদয়ের মাঝে কিছুটা সুখ বিলিয়ে দেয়ার মত আনন্দ হয় তো আর কোথাও নেই।
আযানের ধ্বনি কানে আসার সাথে সাথেই বিছানা ছেড়ে উঠে, ফ্রেশ বাড়ি থেকে বের হয়ে সবাইকে নিয়ে বাসে উঠে বসলাম।
ঘন কুয়াশায় চারিদিক আচ্ছন্ন করে রেখেছে। নিজেকে কিছুটা অসুস্থতার মাঝেই নিয়ে যাওয়া। সকাল বেলা উদরের সমস্যায় খুব ক্লান্ত।
যেতে যেতে গাড়িটা তখন গোমতী নদীর তীর বর্তী। সরু পথের বিশাল গাড়ি, ড্রাইভারের অনেক টা সমস্যা হচ্ছে। তারপর ও আবার ভাঙা রাস্তা।
রাস্তার পাশের খেজুর গাছ।  শীতের সকালে এমন দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক। খেজুর রস আর শীতের পিঠা বাঙালী ঐতিহ্যের একটি অংশ।কলসি ভরে খেজুর রস নিয়ে শহরের দিকে এগিয়ে চলেছে রস বিক্রেতা। পিপাসী মন ছুটে বেড়াই কোন অজানা পথে। গোমতী নদীর উপর দিয়েই বয়ে গেছে আরেকটি ব্রীজ। যেটি টিক্কার চর ব্রীজ নামেই পরিচিত । গোমতি নদীটি তীব্র খরস্রোতা। এই নদীতে জোয়ার ভাটা নেই।
গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের ডুমুর নামক স্থানে উৎপন্ন হয়ে পার্বত্যভূমির মধ্য দিয়ে সর্পিল পথ প্রায় ১৫০ কিলোমিটার অতিক্রম করে কুমিল্লা সদর উপজেলার কটক বাজারের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারপর এটি আঁকাবাঁকা প্রবাহপথে কুমিল্লা শহরের উত্তর প্রান্ত এবং ময়নামতির পূর্ব প্রান্ত অতিক্রম করে দাউদ কান্দিতে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে।
নদীর দুই পাশেই কিছু জনবসতি গড়ে উঠেছে। তাদের অনেকেই শহরের শ্রমিক, অটোচালক, মাঝে মাঝে বর্ষা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরার কিছু দৃশ্য চোখে শহরের দক্ষিন পশ্চিম দিকে আরেকটী ব্রীজ এই নদীর উপর,  পাল পাড়া নামে পরিচিত। খরা মৌসুমে ব্রীজের গোড়া থেকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বালু উত্তোলন করে ,ব্রীজটি এখন হুমকির মুখে।
শহরে প্রবেশ, আগের মত এখন আর গরুর গাড়ি আর ঘোড়ার গাড়ি নেই। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শুনেছিলাম সেদিনের গল্পের মত সোনালী দিন গুলু। এখন সব ইঞ্জিন চালিত, গ্যাস প্যাট্রোল দিয়ে চলে। ইট, বালু আর কনক্রিটের আবদ্ধে ঘেরা মানুষগুলু আজ পাথরের মত। তাদের মনকেও যেন পাথরের শক্ত খোলসে আবন্ধ করেছে।
একটু দুরে একটি ছেলে দৌড়ে আমাদের দিকে আসছে। বাসটি তখন কিছুক্ষনের জন্য থেমে আছে। কাছে আসার সাথে সাথেই বাসটি তখন ছেড়ে দিল। দেখতে পেলাম ছেলেটির হাতে তিলের খাজা। মাঝে মাঝে হাতের কাছে আসলে আর ছাড় নেই।
তিলের খাজা বাংলাদেশের একটি খুবই  মিষ্টি খাবার। সুস্বাদু এবং দামে কম বলে এটি গ্রামে-গঞ্জে মফস্বল এলাকায় খুব জনপ্রিয়। চ্যাপ্টা কিন্তু কিছুটা লম্বাটে । । ভিতরটা খানিকটা ফাঁকা। মুখের ভিতর দিলেই মিষ্টি রস আর তিলের মাতাল করা গন্ধে নিজেকে উন্মাদ করে তোলে। খুব কম সময়েই বেশি খাওয়া যায়। তবে অনেকের রুচি বোধের উপর নির্ভরশীল।

কথিত আছে কুষ্টিয়ার পাল সম্প্রদায়ের লোকজন সর্বপ্রথম খাজা তৈরী শুরু করে। আর সেটিই সারা দেশে চলে। তবে আজকাল অনেক জায়গায় এগুলু তৈরি করতে দেখা যায়।
কিন্তু এখন যে পেয়েও হারালাম। মনে মনে ভাবলাম জীবন বাচার তাগিদে মানুষ কত কিছুই না করে। নানান রমক মানুষের নানা রকম ব্যবসা। সময় যাচ্ছে,  গাড়িটাও দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। বিশ্ব রোড, রাস্তার দুই পাশেই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি কিছুক্ষনের জন্য। মনটা তখন সৃষ্টির ভিতরেই স্রষ্টাকে খোজার চলছে।
কিছু দুর গাড়িটা যাওয়ার পর থেমে গেল। যানজট এর কবলে পড়লে তো আর রেহাই নেই। পাশেই ছিল আমাদের সকলের শ্রদ্ধ্যাভাজন ব্যক্তি হাজী কামাল উদ্দিন মাষ্টার। আমাদের সাথে যারা ছিল , তিনিই ছিলেন সকলের বয়োজ্যেষ্ঠ। বয়স ষাটোর্ধ হবে। ভাগ্যক্রমে উনার পাশেই ছিল আমার আসন। গ্রামের সালিশী বিচারে তিনি ভুমিকা রাখেন। কিছুটা রাগী এবং জেদি। হঠাৎ করেই রেগে যান।তবে অযথা নয়। এর পেছনে যথেষ্ট কারন  থাকে। তাই যানজট নিয়ে মাঝে মধ্যে দুই একটা  উচিত  বচন ছুড়েন।
মাঝে মধ্যে কয়েকটা প্রশ্ন করেন আর আমি হ্যা,  না বলে উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।

অসুস্থতা নিয়ে ভ্রমন করছি তাই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি কিন্তু মনের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছেটা ক্রমে বেড়েই চলেছে।
গাড়িটা তখন ছুটছে প্রচন্ড গতিতে সীতাকুন্ডের দিকে। আমি আর আমার পাশে বয়োজ্যেষ্ঠ সেই ব্যাক্তিটি  মনে করিয়ে দিল আমাকে গ্রান্ড টাংগ রোডের কথা। তিনি আমাকে বললেন এটাই সেই গ্রান্ড ট্রাংক রোড। আগের মত নেই, অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। মেইন রোডে অনেকটা জ্যাম থাকায় চালক তার রাস্তা পরিবর্তন করেছে কিছুক্ষনের জন্য। শুনতে ইচ্ছে হল গ্রান্ড ট্রাংক রোডের ইতিহাস। এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও দীর্ঘতম সড়ক পথ এটি। এই দৈর্ঘ ২৫০০ কি:মি বা ১৬০০ মাইল।

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের বিস্তৃত মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় থেকে ছিল। এটি গঙ্গার মুখ থেকে সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আধুনিক সড়কের পূর্ববর্তী সংস্করণটি সম্রাট শের শাহ শুরি নির্মাণ করেন। তিনি ঘোড়ার ডাকের প্রচলন ও করেন। এতে প্রাচীন মৌর্য সড়কের সংস্কার ও বর্ধিত করা হয়। ১৮৩৩ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্য ব্রিটিশরা এর আরো সংস্কারসাধন করে। আগেকার দিনে তথ্য আদান প্রদানের জন্য ঘোড়ার ডাকের প্রচলন ছিল । এই রোড নির্মান করার পর ডাক আদান প্রদানের বব্যস্থা আরো সহজ হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সুবিধার জন্য নাকি প্রায় দুই ক্রোশ পর পর বিশ্রামাগার এবং সরাই খানার ব্যবস্থা ছিল। রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষ রোপন ছিল  । যাতে করে ক্লান্ত অবস্থায় গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারে। গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ করেই কানে বাজল ছেলে মেয়েদের চিৎকার, হৈ হুল্লোর। বাহিরে তাকিয়ে দেখি আমরা এসে পৌছে গেছে আমাদের সেই সীতাকুন্ডে ।
বাস থেকে মাটিতে পা ফেললাম। মনে হল একটা বুক ভরা দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলতে পারলাম। সবাইকে নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম।
এমন সময় হঠাৎ কানে বাজল ভিতরে ঢুকতে দশ টাকা করে টিকেট লাগবে। তাই নিয়ম মেনে তাই করলাম। সবাই এক সাথে সামনের দিকে হাটছি। খুব ভাল লাগছে। কিছুটা উচু রাস্তা। পাহাড়ের গা ঘেষে এমন রাস্তা শুধু সেখানেই দেখা যায়। যারা ভ্রমন ভালবাসেন তাদের জন্য একটি চমৎকার স্থান। উপভোগ করার মত।
সীতাকুণ্ড পাহাড় হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ। এই পাহাড়টি হিমালয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক ঘুরে ভারতের আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিশেছে। চট্টগ্রাম অংশে ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম শহর পর্য্যন্ত এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার। এই পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত হয়েছে সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক।সীতাকুণ্ড শহরের পূর্বে অবস্থিত চন্দ্রনাথ শৃঙ্গ যা কিনা চট্টগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ স্থান। সাথে আছে রাজ বাড়ি টিলা। চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি এসে এই পাহাড়ের উচ্চতা অনেক কমে এসেছে। চট্টগ্রাম শহরের উপকন্ঠে বাটালি হিল অবস্থিত যা শহর থেকে সামান্য উত্তরে নঙ্গরখানা ২৯৮ ফুট উঁচু। এখানে রয়েছে সহস্রধারা আর সুপ্ত ধারা নামের দুটি জলপ্রপাত। মীরসরাই অংশে রয়েছে খৈয়াছড়া, হরিণমারা, হাটুভাঙ্গা, নাপিত্তাছড়া, বাঘবিয়ানী, বোয়ালিয়া, অমর মানিক্যসহ আরো অনেক অনেক ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। পূর্বদিকে এই পাহাড় থেকে উৎসারিত হয়ে কয়েকটি ঝর্ণা তথা খালহালদা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মাঝে গজারিয়া, বারমাসিয়া,ফটিকছড়ি, হারুয়ালছড়ি এবং বোয়ালিয়া অন্যতম। পশ্চিম দিকে #মহামায়া, মিঠাছড়াসহ আরো কয়েকটি ছড়া ও ঝর্ণাবঙ্গোপসাগরেপতিত হয়েছে। বর্তমানে মহামায়া ছড়ার উপর একটি রাবার ড্যাম নির্মিত হয়েছে। এই লেক দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক, তাছাড়া নীলাম্বর হ্রদ নামে একটি মনোরম লেক এই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।
আমাদের অবস্থান তখন মহামায়া লেকের কাছাকাছি  । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এই লেকটি মনের খোরাক যোগাতে কিছুতেই কার্পন্য করল না। সবাইকে এক সাথে নিয়ে অনেকগুলু স্মৃতি ক্যামেরা বন্ধী করলাম। পাকা রাস্তা বেয়ে পাহাড়ের উপড় উঠা , এ যেন সেনাবাহিনীর কোন ট্রেনিং এ অংশ নেয়া। সেখান থেকে নেমেই চিক চিক করা স্বচ্ছ পানিতে নিজের হাত স্পর্শ করা মাত্রই নিজের হাত শিউরে উঠল। অনেকটা ঠান্ডা, তবে সহনীয়। সময়ের অভাবে বেশিক্ষণ মনটাকে রাখা গেল না আর মায়া ভরা মহামায়াতে। সাথে ছিল কিছু চড়ুই, বাবুই, টুনটুনি আর শ্যামা পাখিদের কলরব। ইচ্ছে মত উড়াউড়ি আর ঘুরাঘুরির নেশা যেন কাটছে না কিছুতেই। সবাইকে নিয়ে ফের পাড়ি জমালাম পতেঙ্গার উদেশ্যে।দৃষ্টির সর্বশেষ শক্তি দিয়ে সৃষ্টির রস আস্বাদন করলাম।
সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। মন তখন পতেঙ্গায়। সময় তখন দুপুর ঘনিয়ে বিকালের দিকে যাচ্ছে। খাবারের কথাটা অনেকের মাথায় কাজ করতেছে। একটা পেট্রোল পাম্পের কাছে গাড়িটা থামিয়ে দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম। খাবারের আয়োজন আগে থেকেই ছিল। সবাই প্লেট হাতে নিয়ে,কেউ বসে আবার কেউ বা দাড়িয়ে । আমাদের সাথে ছিল সাথী মনি নামের একটা টুনটুনি। অনেকটা সোনার চামচ মুখে দিয়েই জন্ম।  বাহিরের পরিবেশে খাবার খাওয়াটা তার অভ্যেসে ছিল না। তাই কিছুটা অসস্থিকর অবস্থায় পড়ে গেছে। তাকে সবাই বুঝালাম। এটাই শিক্ষা। উত্তাল সমুদ্রে যে নাবিক হাল ধরতে জানে, সেই প্রকৃত নাবিক। অনেক প্রতিকুলতার মাঝে যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে সেই প্রকৃত
মানুষ। জীবনটাই সংগ্রাম। আর কিছু বলার আগেই বলে উঠল দু:খিত স্যার। সে শিখেছে কিভাবে ভুল করলে ক্ষমা চেয়ে নিতে হয়। মা বাবার অনেক বাধ্য এবং প্রিয় মুখ সে। এমন প্রিয় মুখ আমাদের কাছে সব ভ্রমন পিয়াষুরা। খুব কম সময়ের মধ্যে আমরা খাবার শেষ করলাম। তারাতারি সবাই গাড়িতে গিয়ে বসলাম। রওনা হলাম অজানার উদেশ্যে।

Comments

Popular posts from this blog

প্রার্থনা

ইচ্ছে মনির ইচ্ছে ঘুড়ি(শিশুতোষ কাব্য গ্রন্থ)