কষ্টের ফেরিওয়ালা

কষ্টের ফেরিওয়ালা
___নজরুল ইসলাম
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
সবার মত করে আমিও তো সুখ চাই কিন্তু সুখ তো ঝরা পাতা, শিমুল তুলার আশ। সে কি আর আমার কাছে থাকে!  কষ্ট করেই জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিলাম। অভাব অনটন আর দুঃখ দুর্দশার মধ্য দিয়েই জীবনের গানি টানা। সবে মাত্র বয়স হল বিদ্যালয়ে যাওয়ার কিন্তু এখন যে ক্ষুদা নিবারনে ব্যস্ত, তাই বিদ্যা গ্রহন করার বিষয়টা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। যেই চিন্তা সেই কাজ। কিছুদিন নিরব প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখের জ্বল শুকিয়ে শুকিয়ে পথ চলেছি। মাঝে মাঝে আহার গ্রহনে বাতাস-ই ছিল একমাত্র পথ্য।
মায়ের চোখের দিকে তাকানো যেত না, তাকাব কি করে, বাবার সেবা করতে করতে চোখ দুটি লাল হয়ে যেত। তখন মায়ের কাছে মনে হত ঘুম হল অচিনপুরের সপ্ন। কত রাত যে বাবার পাশেই অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতেন সেটা কেবল এক মাত্র বিধাতাই জানেন।বাবার হঠাৎ করে প্যারালাইজড হওয়া আর আমাদের জীবনের পথে মাউন্ট এভারেস্ট এর বিশাল পথ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এর মাঝের ছোট বোনটির আধো আধো বুলি। কত যে সপ্নের সাজানো সংসার কতগুলু কালো মেঘ এসে এক নিমিষেই সব অন্ধকারে ঢেকে দিয়ে গেল। ছোট বোনটির নাম রাখা হল আখি।জানি না আখি কি আখি ঝারাতেই এসেছিল। পৃথিবীটা তার কাছে সপ্নের ঘর। সবাই বলে এই মেয়েটি কাল।  জন্ম নেবার সাথে সাথে বাবার অসুস্থতা। সব কিছু কম থাকলেও কুসংস্কার কিন্তু কম ছিল না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমন। মেয়েদের একটু বাকা চোখে দেখে। সেই কাল থেকে এই কাল। হিন্দু প্রথা আর মুসলিম। কোনটাই বা বাকি ছিল। উইপোকার মত সমাজের সকল স্তরে প্রবেশ করতে বিন্দুমাত্র ও সময় নিত না। সে কি বলা চলে। আমার কাছে আবার এই সবের ঠাই নেই।
আখিকে আমার আখির মধ্যেই রেখেছি। এভাবেই কিছু কষ্ট কুড়ানো ভালবাসার চাদর মুড়িয়ে দিতাম তার গায়ে। তখন কোথায় ছিলাম জানি না। একটা সময় অনেক কেদেছি।  মায়ের চোখের কান্না মুছার স্বপ্ন ছিল কিন্তু বাস্তবতার বেড়াজালে নিজেকে আর ঘরে তুলতে পারলাম না।
শুনেছি মানুষ নাকি অদ্ভুদ প্রানী। আসলেই অদ্ভুদ!  বাবা যখন অসুস্থ, তখন ধারের টাকা পরিশোধ করতে  অক্ষম।  আর সেই মুহুর্তেই খুব কাছের এক আত্নীয় টাকার পরিবর্তে ঘরের দরজাটা খুলে নিয়ে যায়।
অবাক হবার কিছুই নেই।  যার ঘরে আকাশ দেখা যায়, বাহিরে এক ঘন্টা বৃষ্টি হলে, ভেতরে হয় তিন ঘন্টা, সেটা তো স্বভাবই ঘটতে পারে। তারপর ও মানুষ যে কতটা নিষ্টুর এটা কেবল জানতে শিখলাম।
এই কথা গুলু অনর্গল ভাবেই বলে গেলাম আমি। পাশেই ছিল আমার এক বন্ধু। মাঝে মাঝে দেখতে পেলাম দু'চোখ দিয়ে তার অক্ষি যোগল হাত বুলিয়ে নিল। বললাম চোখে কিছু পড়ল?
না। এমনিতেই চোখ গুলুতে মনে হয় এলার্জি হয়েছে। কেমন জানি করে।
আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আমার কথায় কিছুটা আবেগপ্লবন হয়ে হয়তো চোখের এলার্জিটা বেড়েছে।
যাই হোক __
সামনে ঈদ। ঈদের উৎসবে হয়তো কিছুটা সুখ কুড়িয়ে নেয়া যাবে। গরীবের সুখের ছোয়া আবার মরুভুমির বালুচড়ে মরীচিকার মত। দেখা যাবে কিন্তু নিমিষেই শেষ।
এই তো গেল বছর আখির চোখের জ্বল এর কথা মনে পড়লে মনটা হঠাৎ করেই আতকে উঠে। বাড়িতে সবাই সুন্দর সুন্দর জিনিস কিনছে, বোনটি আমার ভাইয়া বলে ডেকে কাছে নিয়ে বলল, ভাইয়া আমাকে একটা সুন্দর সিটি গোল্ড এর হার কিনে দিবেন?
আমি বললাম দেব ভাইয়া।
দেব বলেছি কিন্তু দেবার ক্ষমতা যে আমার ছিল না। অতি কষ্টে দিনাতিপাত করতে হতো। জীবনের খেলাঘরে মনে হল শুন্যতাই বিরাজ করছিল সারাটা সময়। চোখের নোনাজ্বল যে থেমে থাকার মত নয়। এক নিমিষেই বেড়িয়ে পড়ল।

Comments

Popular posts from this blog

প্রার্থনা

ইচ্ছে মনির ইচ্ছে ঘুড়ি(শিশুতোষ কাব্য গ্রন্থ)